নরসিংদীতে ভাষা-আন্দোলন ও ভাষা সংগ্রামী

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৪:১২ পিএম | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২০, ০৩:৩৬ পিএম


নরসিংদীতে ভাষা-আন্দোলন ও ভাষা সংগ্রামী

-ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন-

ভাষা মানব জীবনের অমূল্য সম্পদ। ভাষা শুধু যে মনের ভাব প্রকাশের বাহন তা’নয়, ভাষা একটি দেশের শিক্ষা, সভ্যতা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনীতি, গণতন্ত্রেরও বাহন। ভাষার মাধ্যমে প্রত্যেকটি জাতির উন্নয়ন ও বিকাশ ঘটে থাকে অর্থাৎ ভাষা জাতির অস্তিত্বের সাথে জড়িত। তাই ভাষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা। পৃথিবীর নানা ভাষার মধ্যে বাংলা হলো অন্যতম প্রধান ভাষা। এই ভাষা জন্মের পর থেকে দীর্ঘ কন্টাকীর্ণ পথ অতিক্রম করে এসেছে। পাকিস্তান সৃষ্টির বহু পূর্ব থেকে সেই সুপ্রাচীন কালে থেকেই লেখক ও চিন্তাবদরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিষয়টি তুলে ধনের সংবাদ পত্র ও পুস্তক পুস্তিকায় পাতায়। বাংলা ভাষার উপর সর্বশেষ আঘাত আসে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সাথে সাথে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর শাসকচক্র পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দূকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র শরু করে। পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হিসেবে তাদের প্রাণপ্রিয় বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠে। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আেেন্দালন মানেই আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষায় আন্দোলন। এই উপলদ্ধি থেকেই শরু হয় ভাষা আন্দোলন।


ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যময় ঘটনা। আমাদের মহান স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল ভাষা -আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। এই মহান ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতি বিজড়িত ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাঙ্গালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে অন্যতম ও শ্রেষ্ঠ অর্জন হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও অমর একুশে আজ আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার।


১৯৪৭ সালে ভাষা-আন্দোলনের সূচনা পূর্ব থেকেই নরসিংদীতে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু হয়। রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন শুরুর পেছনে নরসিংদীর কৃতি সন্তানদের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর শাসকচক্র পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে সর্বত্র উর্দু ভাষা চালুর ষড়যন্ত্র শরু করে। নবগঠিত রাষ্ট্রের পরিচালনা, কাঠামো ও ভাষারসহ অন্যান্য বিষয়ে আলোচনার জন্য মে মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় রাজনৈতিক কর্মী, বৃুদ্ধজীবী, ছাত্রনেতা, সাংবাদিক ও অধ্যাপকের এক সভা অনুষ্ঠিত হয় নরসিংদীর বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও রাজনীতবীদ রাজীউদ্দিন ভূঁইয়ার (উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম মহিলা চিকিৎসক ও ভাষাসৈনিক অধ্যাপক ডা. জোহরা বেগম কাজীর স্বামী) দোতলা বাড়ির বিরাট হল রুমে। এটা ছিল পাকিস্তান সৃষ্টির পর ঢাকার প্রথম সাংস্কৃতিক বৈঠক। সেখানে অন্যান্য বিষয়ের সাথে ভাষার প্রশ্নটিও আলাচিত হয়। উক্ত বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নরসিংদীর কৃতি সন্তান, রাজী উদ্দিন ভূঁইয়া ও ডা. জোহরা কাজীর ভূমিকা ছিল অনবদ্য। এর অল্প কিছুদিন পর ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭ তারিখে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের তৎকালীন শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাসেমের উদ্যোগে ঢাকার ১৯নং আজিমপুরে গঠিত হয় ভাষা-আন্দোলনের সূচনাকারী সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’।


তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে এই সময় নরসিংদীতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এডভোকেট ফজলুর রহমান ভূঁইয়া নরসিংদীতে ভাষা-আন্দোলন সংগঠনে বিশেষ অবদান রাখেন। জনাব ফজলুর রহমাননের জন্মস্থান নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার অন্তর্গত লেবুতলা ইউনিয়নের তারাকান্দি গ্রাম। ভাষা-আন্দোলনের সেই সূচনা পর্ব থেকেই তিনি ভাষা-আন্দোলনকে সংগঠিত করার জন্য তাঁর নিজ এলাকা নরসিংদীতে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং তারই উদ্যোগে তখন নরসিংদীর বিভিন্ন স্থানে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং তমদ্দুন মজলিসের শাখা গঠিত হয়। ভাষা-আন্দোলনের সূচনাকারী সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’ নামটিও তার দেয়া। তিনি মনোহরদী, হাতিরদিয়া এবং নরসিংদীর অন্যান্য অঞ্চলে এ সময় তার সমমনা লোকদেরকে এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত করেন। ১৯৪৭ সলে ভাষা-আন্দোলনের সেই সূচনা পর্বে বাংলাকে যখন অনেকেই পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপরে দ্বিধান্তি ছিলেন,তখন থেকেই বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রচেষ্টায় তিনি নরসিংদী এবং ঢাকায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। নরসিংদীর মনোহরদীর আরেক কৃতি সন্তান আজকের আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মরমি ও মানবতার কবি সাবির আহমেদ চৌধুরী ছিলেন ১৯৪৭-৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলনের সাহসী সৈনিক। তার জন্মস্থান মনোহরদী উপজেলার (বর্তমানে বেলাব) হাড়িসাঙ্গান গ্রামে। সাবির আহমদের সহযোগী হিসেবে এ সময় ঢাকা এবং মনোহরদী তথা নরসিংদীতে ভাষা-আন্দোলনে আরও যারা অগ্রনি ভূমিকা - পালন করেছিলেন তারা হলেন-মহসিন ভূঁইয়া (মনোহরদী, চুলা), মোশারফ ও ইসমাইল (নরসিংদী)।


১৯৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলনে নরসিংদীতে ব্যাপক তৎপরতা দেখা যায়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা শহরে এবং পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র হরতাল পালিত হয়। এটি ছিল পাকিস্তান উত্তর প্রথম হরতার কর্মসূচি। এদিনে নরসিংদীতে পরিপূর্ণভাবে হরতাল কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ভাষা-আন্দোলন ভালোভাবে রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করার পূর্ব পর্যন্ত উপদলীয় নেতারা প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র ও অন্যান্য কর্মীদের সাথে যোগাযোগের জন্য মাঝে মাঝে সফর করতেন। সেই উদ্দেশ্যে নরসিংদীতে একটি কৃষক সভার আয়োজন করা হয়। সেই সভায় মুহম্মদ আলীর সভাপতিত্ব করার এবং ড. মালেক, তফাজ্জল আলী, কামরুদ্দীন আহমদ প্রমুখ কয়েকজনের বক্তৃতা দানের কথা ছিল। নির্ধারিত দিনে সকাল দশটার সময় অর্থাৎ ট্রেন ছাড়ার কিছু পূর্বে মুহম্মদ আলী নরসিংদী না যাবার সিদ্ধান্ত জানিয়ে কামরুদ্দীন আহমদকে খবর দেন। এর কারণ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, জিন্নাহর কাছে এই মর্মে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তাঁর জমিদারী কর্মসূচিকে রাষ্ট্রদ্রোহী বিবেচনা করায় তার পক্ষে কৃষক সভাটিতে যাওয়া আর সম্ভব নয়। তফাজ্জল আলী বলেন যে, মুহম্মদ আলীর সিদ্ধান্ত জানার পরও তিনি নরসিংদী যাবার কর্মসূচি পরিবর্তন না করে পূর্ব কথামতো সেখানে যান এবং যথারীতি বক্তৃতা করেন।


১৯৪৮ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ব্যাপক গতি লাভ করে এবং ভাষা-আন্দোলনের পক্ষে ব্যাপক জনমত গড়ে ওঠে। নরসিংদীতেও এ আন্দোলনের তীব্রতা প্রকাশ পার্যায়ে। এ সময় একপর্যায়ে নরসিংদী সফরে আসেন মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, তৎকালীন এম, এল, এ আনোয়ার বেগম। তারা এক বিরাট জনসভায় বক্তৃতা করেন। এ সভায় প্রচুর লোকের সমাবেশ ঘটে। বাংলাভাষাসহ পাকিস্তানের বৈষম্য এবং মুসলিম লীগ সরকারের স্বৈরাচারী শাসনের প্রতি নরসিংদীবাসী সচেতন হয়ে ওঠে। ১৯৪৮ সাল থেকেই নরসিংদীর মোসলেম উদ্দিন ভূঁইয়া ভাষা আন্দোলন সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তার বন্ধু সাদত আলী শিকদার তখন ঢাকা মেডিকেল হলের ভিপি। তার উৎসাহেই মোসলেম উদ্দিন ভূঁইয়া বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের মিটিং মিছিলে অংশ নেন।


১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনে নরসিংদীর ভূমিকা ছিল অগ্রণী। নরসিংদী ছাত্র-যুবকদের উদ্যোগে আন্দোলন গড়ে ওঠে। মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে আসা ছাত্র-যুবকরাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে কিংবা ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক নরসিংদীতে সাংগঠনিক সফরে আসেন। ঢাকার আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার জন্য স্থানীয় যুবক-ছাত্ররা তাকে চাঁদা তুলে দেয়। তাঁর সফরের পর নরসিংদীতে ছাত্র-যুবকদের মধ্যে ভাষার প্রশ্নে সচেতনতা দেখা দেয়। মিটিং-মিছিল ও সভা সমাবেশের কর্মসূচি নেয়া হয়।


নরসিংদীর ঐতিহাসিক উয়ারী বটেশ্বর এর প্রত্মতাত্তিক নিদর্শন সংগ্রহ ও গবেষণার পথিকৃৎ মোহাম্মদ হানিফ পাঠান ১৯৪৮ সাল থেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। ১৯৫১ সালে জমিয়তে ওলামায়ে এছলাম কতৃর্ক বাংলাভাষা বিরোধী ‘উর্দূর পক্ষে পঞ্চাশ পয়েন্ট’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। মোহাম্মদ হানিফ পাঠান এর প্রতিবাদে নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-শিক্ষক নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে তিনি রায়পুরা সহ বিভিন্ন এলাকায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সভা সমাবেশ ও মিছিল করেন। এ সময় তিনি সামছুল হক মোল্লা (প্রধান শিক্ষক, লাখপুর হাইস্কুল), আজিম উদ্দিন আহমেদ (শিক্ষক, পরে এডভোকেট), আবদুর রহমান মাষ্টার (শিক্ষক, মরজাল হাইস্কুল), আবদুস সালাম (প্রধান শিক্ষক, নারায়ন পুর হাই স্কুল), মতিউর রহমান ( বেলাব), প্রমুখকে নিয়ে নিজ এলাকায় ভাষা-আন্দোলন পরিচালনা করেন। তাছাড়াও বাংলাভাষা বিরোধী পুস্তিকার প্রতিবাদ স্বরূপ ‘বায়ান্নর পান্ডুলিপির; বাংলা বনাম ঊর্দূ রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক নামে একটি বই লিখেন। উক্ত বইয়ে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।


১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিবর্ষণে ছাত্রদের মৃত্যুর খবর নরসিংদীতে পৌছলে নরসিংদীবাসী গর্জে ওঠে। আন্দোলনের নেতৃত্বে দিতে এগিয়ে আসেন আবুল হালিম, আফসার উদ্দিন, মুসলেহ উদ্দিন ভূঁইয়া, রমিজ উদ্দিন, করিম মিয়া, কফিল উদ্দিন ভূঁইয়া, সামাদ মৌলভী ও চাঁদ মিয়া। ২১ ফেব্রুয়ারির পর ঢাকার সকল কর্মসূচির প্রতি একাত্ম প্রকাশ করে নরসিংদীতে সকাল হতে রাস্তাঘাট, রেলপথ এবং নরসিংদীর গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশ কর্তৃক ছাত্র-জনতাকে বাঁধা প্রদান না করায় কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে দোকানপাট বন্ধ ছিল এবং দুপুরের পর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শরু হয়। রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে তহবিল সংকটের সৃষ্টি হলে মওলানা ভাষানী ও আবুল হাশিমের নির্দেশে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” ব্যাজ এবং সীলগালা করা কৌটা নিয়ে একদল ছাত্রের সঙ্গে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন নরসিংদীর মোছলেহ্ উদ্দিন ভূঁইয়া।

ন্যায্য সংগ্রামে আন্দোলনে পুলিশের গুলিবর্ষনের মাধ্যমে বেশ ক’টি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার খবর ছড়িযে পড়ার সাথে সাথে সমগ্র বাংলা উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছিল। ২২ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীতে ও মিছিল হয়েছে জব্বার, রফিক, বরকতদের প্রাণ হরণের প্রতিবাদে এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার সমর্থনে। স্বাভাবিকভাবেই আয়োজক ও নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন মোছলেহ্ উদ্দিন ভূঁইয়া সহ অন্যান্যরা। এখানে উল্লেখ্য যে, জানুয়ারির শেষদিকে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণা সম্পাদক শাসমুল হক একাই ভূঁইয়াদের বাড়ি এলেন। তিনি যাবেন শ্বশুড় সেকান্দার আলী মাষ্টার ছিলেন সত্যিকার অর্থেই নরসিংদীর সিংহপুরুষ। তিনি ঢাকা জেলা ও লোকাল বোর্ডের মেম্বার ছিলেন। কন্যা আফিয়া বেগম ব্রিটিশ আমলে এম.এ. পাশ করে ছিলেন। সেকান্দার মাষ্টারের এম.এ. ডিগ্রীধারী কন্যা এই আফিয়া বেগমকেই বিবাহ করেছিলেন শামসুর হক সাহেব। শামসুল হক মোছলেহ উদ্দিন ভূঁইয়াকে বললেন, রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই এই ধরনের কিছু কুপন প্রয়োজন। কিছু অনুদান ব্যবস্থা কর। তখন প্রায় দুইশত টাকার মতো অনুদান সংগ্রহ করলেন কিছু যুবক ছেলে মিলে এবং সম্পূর্ণ টাকা শামসুল হক সাহেবের হাতে তুলে দেন। একই দিনে শামসুল হক সাহেবের কাছ থেকে নরসিংদীতে একটি সভার তারিখ নেন। সিদ্ধান্ত হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীতে জনসভা হবে। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত থাকবেন তিনি নিজে, মাওলানা ভাসানী এবং দলের অন্যতম যুগ্মসম্পাদক রফিকুর ইসলাম।

২৩ ফেব্রুয়ারির জনসভার প্রচার চলাকালীন সময়েই ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক উত্তাল অবস্থায় তারা ধারণা করেন ২৩ তারিখের সভা সম্ভব হবে না। মওলানা ভাসানী এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যেই পূর্ব ঘোষণা মোতাবেক নরসিংদীতে জনসভা করতে রাজী হলে ফুলবাড়িয়া স্টেশনে এসে প্রথমশ্রেণীর টিকেট কেটে নরসিংদী নিয়ে যান। রীতিমতো ভন্ডুল একটি জনসভা এই পরিস্থিতিতে সর্বপ্রধান জাতীয় নেতার উপস্থিতিতে সার্থক করার আনন্দ মোসলেহ উদ্দিন ভূঁইয়ার বুকে খুব করে বেজেছিল। পরে জানা গেছে মওলানা ভাসানীকে তেজগাঁও স্টেশনেই গ্রেফতার করার জন্য পুলিশ রীতিমতো প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু যথাসময়ে ট্রেন ছেড়ে দেয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি। মাওলানা ভাসানী পূর্ব নির্ধারিত জনসভা করার জন্য নরসিংদী রওয়ানা হয়ে গেছেন জানতে পেরে নির্ধারিত বক্তা রফিকুল ইসলামও নরসিংদী এসে উপস্থিত হন। শামসুল হক এর মধ্যেই গ্রেফতার হয়ে যাওয়ায় আসতে পারেননি।


২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দানে বিরাট জনসভায় রফিকুল ইসলাম ও মাওলানা ভাসানী বক্তৃতা করেন। এই সভার সভাপতি ছিলেন নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি আফসার উদ্দিন সরকার। সভায় তেজোদপ্তি কণ্ঠে মওলানা ভাষানী বলেন, মুসলিম লীগ সরকারের পতনের জন্য সকল ট্রাক্স বন্ধ করে দিত হবে। গুলিবর্ষণের তদন্ত ও বিচার করতে হবে। বাংলাকে একমাত্র রাষ্টট্রভাষা করতে হবে। নাজিমউদ্দিন সরকারকে পদ থেকে টেনে নামাতে হবে।


ভাসানীকে গ্রেফতারের জন্য ইতোমধ্যে গোয়েন্দা পুলিশ নরসিংদী পৌছে গেছে। তারা এক মিষ্টির দোকানের আড়ালে, আশপাশের চা দোকনে একজন ডি এস পির নেতৃত্বে ছদ্মবেশে অবস্থান করছিল। সভাশেষে মাওলানা ভাসানী সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ মোছলেহ্ উদ্দিন ভুঁইয়ার বাড়িতে রাতে খাবার খান। পরে ফরিদ উদ্দিন ও চান মিয়ার সহযোগিতায় হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে ভাসানীকে ষ্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। ষ্টেশনে পুলিশের অবস্থান বুঝতে পেরে তারা মাওলানা ভাসানীকে হাজীপুর গ্রামে এক নিরাপদ আস্তানায় নিয়ে যান। পরে একদিন পর নৌকা যোগে নারায়ণগঞ্জ হয়ে তিনি ঢাকা পৌছান।


নরসিংদীর ভাষা-আন্দোলনের নেতা এবং কর্মীদের এই আলোচনা সভাটি ছিল ঐতিহাসিক। অন্যান্য থানা হতে কেউ সাইকেলে এমনকি পায়ে হেঁটে নরসিংদী সদরে এসে আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করেন। বিকেলের এই সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় (ক) রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে যে আন্দোলনের ডাক দিবে তাতে আমরা সাড়া দেব (খ) ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সরকার যে ঘটনা ঘটিয়ে পূর্ববাংলার মানুষকে দাবিয়ে দেবার চেষ্টা করছে তা বানচাল করতে হবে। এপর সন্ধ্যার পূর্বে সারা শহর মিছিলে মুখরিত হয়ে ওঠে। এরপর নরসিংদীতে পুলিশের নির্যাতন ও ধরপাকর শুরু হয়। ভাষা-আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে পুলিশ নরসিংদীর নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার শুরু করেন। এ সময় প্রবীন রাজনীতিবিদ আবুল হাশি মিয়া, আবুল ফজল মিয়া, সুরেশ পোদ্দার ও সৌরদানন্দ লেন্টুকে পুলিশ গ্রেফতার করে। মোছলেহ্ উদ্দিন ভূঁইয়া গ্রেফতার এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন।


১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কারারুদ্ধ ভাষাকর্মী আজমুল হোসেনের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের কামরায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের বৈঠক হয়। এই বৈঠকে ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সাধারণ ধর্মঘটের ঘোষণা করা হয়। সরকারের দমননীতির কারণে ঢাকার কোন প্রেস থেকে নগদ টাকাও হরতাল সংক্রান্ত ইশতেহার ছাপাতে রাজী না হওয়ায় যুবলীগ যুগ্ম সম্পাদক জনাব মো: সুলতান ও কাজী আজিজুর রহমান নরসিংদী থেকে বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে আনেন এবং তা ঢাকা শহরে বিলি করা হয়।


ঘোড়াশাল হাইস্কুলের ছাত্রবৃন্দ ২৩ তারিখে পূর্ণ ধর্মঘট পালন করে এক সভায় কয়েকটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। একটি প্রস্তাবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে শহীদদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি জানিয়েছে এবং নুরুল আমিন মন্ত্রীসভার পদত্যাগ দাবি করেছে।
২৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আদিয়াবাদ এছলামিয়া হাইস্কুলের ছাত্রদের এক সভায় গৃহীত এক প্রস্তাবে নিরস্ত্র জনসাধারণ ও ছাত্রদের উপর পুলিশের বেপরোয়া গুলি চালনার তীব্র্র প্রতিবাদ করা হয়েছে। অপর একটি প্রস্তাব শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করা হয়। নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করিয়া অপরাধী কর্মচারীদের শাস্তি ও নুরুল আমিন মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবি করে সভায় প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় ।


১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা তৈরি করেন প্রথম শহীদ মিনার। ভাষাশহীদ বরকত যেখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন সেই মেডিকেল ব্যারাকের ১৩ নং কক্ষের সামনেই স্থাপতি হয়েছিল শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ। শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ অর্থাৎ প্রথম শহীদ মিনার আজ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই মহান স্থাপত্যকীর্তিটি নির্মাণের সাথে জড়িত ছিলেন তৎকালীন মেডিকেল কলেজের ছাত্র নরসিংদীর ডা. ফজলুর করিম পাঠান। তিনি তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৩য় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।


১৯৫২ সালে ভাষা-আন্দোলনের বিস্ফোরণ পর্বের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে নরসিংদী সদরসহ থানা পর্যায়ে। ঢাকায় নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য ২৮ ফেব্রুয়ারি মনোহরদী থানার হাতিরদিয়া বাজারে এক জনসভা হয়। সভায় প্রায় ১৫ হাজার লোক উপস্থিত ছিলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন ডা. মোজাফফর হোসেন। এদিন হাতিরদিয়া, মনোহরদী, শিবপুর ও শিমুলিয়ার পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। সভায় ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষনের তীব্র নিন্দা, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ, গুলিবষর্ণ সম্পর্কে নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের প্রকাশ্য বিচার, নিহতদের অভিভাবকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি পালিত হয়। স্থানীয় স্কুল-কলেজ, দোকানপাট বন্ধ থাকে। বেলা ১১ টায় ছাত্রদের এক মাইল লম্বা শোভাযাত্রা বের হয়। এদিন বিকেলে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় পুলিশের গুলিবর্ষণের নিরপেক্ষ তদন্ত ও ভাষা-আন্দোলন সম্পার্কিত আটক বন্দিদের মুক্তি দাবি করা হয়।
২৯ ফেব্রুয়ারি,১৯৫২ তারিখে নরসিংদীর শিমুলিয়ায় এক বিরাট সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২৬ ও ২৭ তারিখ শিমুলিয়া বাজারে হরতাল পালিত হয়। এ খবরটি ৪ মার্চ ১৯৫২ তারিখে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

২৮ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি শিবপুর হাইস্কুলের ছাত্ররা ধর্মঘট পালন করেন।‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ‘আরবি হরফে বাংলা চলবে না’ ছাত্রবন্দিদের মুক্তি চাই’ ইত্যাদি স্লোগানসহ এক মিছিল বের হয়। বেলা ৪টায় ধানুয়া ঈদগাহ ময়দানে মৌলভী মোহাম্মদ আলীর সভাপতিত্বে এক জনসভা হয়। এ সভা আনুমানিক রাত ১০ টা পর্যন্ত চলে। সভায় ৪/৫ হাজার লোক সমাগত হয়। সভায় দু’টি প্রস্তাব গৃহীত হয়:


১। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য গণপরিবষদের কাছে দাবি রে এবং ভাষা আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছে তাদের পরিবারবর্গকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপুরণ দেযার জন্য সরকারে কাছে দাবি জনায়।
২। এ সভা ঘোষণা করে যে, যতদিন পর্যন্ত বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানর রাষ্ট্রভাষারূপে সরকার স্বীকার না করবে ততদিন দেশব্যাপী তাদের এই ন্যায্য দাবির জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাবে।


পলাশ থানার পলাশ বাজরে পুলিশেল গুলীবর্ষণের প্রতিবাদে এক সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন হাজী নওয়াব আলী। এই সভায় ৩/৪ হাজার লেকা সমবেত হয। ঢাকায় গুলীবর্ষণের ফলে নিহত ছাত্রদেরপতি সম্মান প্রদর্শনকল্পে ৫ মার্চ রায়পুরায় শান্তিপূর্ণ হরতাল প্রতিপালিত হয়। রায়পুরা স্কুলের ছাত্রদের উদ্যোগে এখানে এক সভা হয়। সভায় কয়েক হজার লোকের সমাগম হয়। জনাব আবদুর রহমান সরকার সভাপতিত্ব করেন। সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রাভাষার মর্যাদা দান, বিনা শর্তে রাজবন্দিরেদর মুক্তি, গুলীবর্ষণ সম্পর্কে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনও দোষী ব্যক্তিদের বিচার এবং নিহতেদের ক্ষতিপুরণ দাবির করিয়া প্রস্তাব গৃহীত হয়। রাপুরায় অনষ্ঠিত সমাবেশ সম্পর্কে ৮ মার্চ, ১৯৫২ তারিখে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবদেনে বলা হয়:


“রায়পুরা (ঢাকা) ৫ই মার্চ। -ঢাকায় গুলীবর্ষণের ফলে নিহত ছাত্রদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকল্পে অদ্য রায়পুরার শান্তিপূর্ণ হরতাল প্রতিপালিত হয়। রায়পুরা স্কুলের ছাত্রদের উদ্যোগে এখানে এক সভা হয়। সভায় কয়েক হজার লোকের সমাগম হয়। জনাব আবদুর রহমান সরকার সভাপতিত্ব করেন। সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রাভাষার মর্যাদা দান, বিনা শর্তে রাজবন্দিরেদর মুক্তি, গুলীবর্ষণ সম্পর্কে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনও দোষী ব্যক্তিদের বিচার এবং নিহতেদের ক্ষতিপুরণ দাবির করিয়া প্রস্তাব গৃহীত হয়।”সংবাদদাতা
৫ মার্চ, ১৯৫২ তারিখে নরসিংদী সদরেও হরতাল পালিত হয়। এ প্রসঙ্গে ৮ মার্চ ১৯৫২ তারিখে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় এক রিপোর্টে বলা হয়:


১৯৫২ সালে জগন্নাথ কলেজের ছাত্র নরসিংদীর মোঃ নবীউল হক রিকাবদার ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার ঐতিহাসিক সমাবেশ ও মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। একুশের মর্মান্তিক মত্যাকন্ডের আরেক প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন তৎকালীন স্কুল ছাত্র (পরে প্রিন্সিপাল) আবদুস শহীদ। তার বাড়ি মনোহরদী থানার বীর আহম্মদপুর গ্রামে। ঢাকা থেকে ফিরে একুশের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে মনোহরদী থানায় আন্দোলন ও প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন তিনি। ২৫ ফেব্রুয়ারি সাদত আলী ইংরেজি স্কুলের সকল ছাত্ররা তারই নেতৃত্বে কালোব্যাজ ধারণ করে এবং বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণ করে। হাতিরদিয়া স্কুলের নূরুল ইসলাম মোল্লা হাতিরদিয়া স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল করেন এবং লাগাতার স্কুল বর্জনের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। নরসিংদী সদর উপজেলার বাহারুল উলুম মো: দেওয়ান বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে গান লিখে নিজেই সুর করে সভা-সমিতিতে পরিবেশ করতেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে আরেক সাহসী সৈনিক ছিলেন নরসিংদীর গর্বিত সন্তান আবদুল করিম পাঠান। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তখন। থাকতেন ফজলুল হক মুসলিম হলে। আজকের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ভাষাসৈনিক জিল্লুর রহমান প্রয়াত ভাষা সৈনিক গাজীউল হক ছিলেন তার রুমমেট। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন প্রায় প্রতিটি পর্বে তাঁর ভূমিকা ছিল খুবই স্মরণীয় ঢাকায় ও স্থানীয়ভাবে নরসিংদীর আরো যারা ভাষা-আন্দোলনের প্রায় প্রতিটি পর্বে ভূমিকা রাখেন তারা হলেন, রিয়াজ উদ্দিন মোল্লা ( সৈদের গাঁও), নূরুল ইসলাম মোল্লা (চর মনোহরদী), ইনামুল হক (কুচেরচর), আশরাফ হোসেন খান (সৈয়দের গাঁও), ফিরোজ আল মুজাহিদ (রায়পুরা), মোঃ কমর উদ্দিন সরকার (মনোহরদী), মোঃ আবু তাহের ভূঁইয়া (রায়পুরা), মহিউদ্দিন আহমদ (রায়পুরা), মোহাম্মদ আলী (রায়পুরা) প্রমুখ।
নরসিংদীর গর্বিত সন্তানদের মধ্যে যারা ঢাকার রাজপথে আন্দোলন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন লেখক,কবি, ভাষা সংগ্রামী ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ। তিনি নরসিংদীর রায়পুরা থানার রামনগর গ্রামের কৃতী সন্তান। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের দু’টি ঐতিহাসিক ঘটনার জন্মদাতা তিনি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রহত্যার পর আলাউদ্দিন আল আজাদের উদ্যোগেই একুশের প্রথম বুলেটিন প্রকাশিত হয়েছিল। বুলেটিনটির শিরোনাম ছিল “বিপ্লবের কোদাল দিয়ে আমরা অত্যাচারী, শাসক গোষ্ঠীর কবর রচনা করব।’ উক্ত শিরোনামটি লিখেছিলেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। এটাই ছিল একুশের প্রথম বুলেটিন। তাছাড়া প্রথম শহীদ মিনার নিয়ে তিনিই প্রথম কবিতা রচনা করেছিলেন সেই ঐতিহাসিক কবিতা, “স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু আমরা এখনো চার কোটি পরিবার, খাড়া রয়েছি তো”।


এ কবিতা শুধু কবিতা নয়, শোকগাথা নয়, এ কবিতাটি ছিল সার্বজনীন জনমানুষের সংগ্রামী চেতনার প্রতীক। এই অমর, অজয়, অবিস্ময়ণীয় কবিতাটির জনক নরসিংদীর উর্বর মৃত্তিকার গর্বিত সন্তান আলাউদ্দিন আল আজাদ। ভাষাসংগ্রামী মুখলেছুর রহমান নরসিংদীর আরেক সূর্য সন্তান য়ার গৌরবদীপ্ত অবদান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে স্মরনীয় হয়ে থাকবে, তার পৈতিৃক নিবাস নরসিংদীর চিনিশপুর গ্রামে। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য। ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ তারই প্রস্তাবক্রমে ঐ কমিাটির আহবায়ক নির্বাচিত হন আবদুল মতিন।

নরসিংদীর শিবপুরের সন্তান একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাষাসংগ্রামী মোহাম্মদ মাশির হোসেনের উদ্যোগে সর্বপ্রথম আবদুল গাফফার চৌধুরীর “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি আবদুল লতিফের কণ্ঠে গীত হয়েছিল। এ সময় তিনি ছিলেন ঢাকা কলেজের ভিপি। এ কারণে তিনি কলেজ থেকে বহিস্কৃত হন। নরসিংদীর জেলার মনোহরদী থানার অধ্যাপক হাবিবা খাতুন একুশের হত্যাকান্ডের পর ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে রাজপথের মিছিলে অংশগ্রহণ করেন, এবং প্রথম কোন স্কুলে শহীদ মিনার নিমার্ণে অংশগ্রহণ করেন। তখন তিনি সরকারি কামরুন্নেছা স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। এই স্কুলের ছাত্রীরাই প্রথম শহীদ মিনার নির্মান করেছিলেন এবং এটাই ছিল কোন স্কুলে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার।


নরসিংদীতে প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয় ১৯৫৪ সালের শেষের দিকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ছাত্র জনতার সর্বাত্মক অংশগ্রহণের কারণে সে সময় শহীদ মিনার নির্মাণে তেমন একটি বাধা আসেনি। শহীদ মিনার নির্মাণের পূর্ব পর্যন্ত অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ তাতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হতো। অস্থায়ী শহীদ মিনারে নির্মাণ করা হতো স্থানীয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ১৯৫৪ সালে প্রথম শহীদ মিনারটি এখন নরসিংদী মহিলা কলেজের চত্বরে অবস্থিত।


নরসিংদী জেলা তথা দেশের সর্ববৃহৎ উপজেলা রায়পুরার ১০৭টি শহীদ মিনারের মধ্যে প্রথম শহীদ মিনার উপজেলা সদরের সেরাজনগর এম এ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শহীদ মিনার। রায়পুরার বিশিষ্ট রাজনীতিক ও মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আফজাল হোসাইন জানান ১৯৬৯ সালে সেরাজনগর এম এ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও রায়পুরা কলেজের চত্বরে এ উপজেলার প্রথম স্থায়ী ও পাকা শহীদ মিনার নির্মিত হয়। এর আগে ২১ ফেব্রুয়ারিতে অস্থায়ীভাবে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হতো। উক্ত বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মোঃ ইসলাম উদ্দীনের তত্ত্বাবধানে এ শহীদ মিনার নির্মাণে প্রেরণা যোগায় তৎকালীন রায়পুরা কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল মোমেন ভূঁইয়া, তৎকালীন ছাত্রনেতা মোঃ আফজাল হোসাইন, জালাল উদ্দিন, হারুন অর রশিদ, হাফিজ উদ্দিন মোল্লা, আকবর আলী, মজিবুর রহমান তোতাসহ আরো অনেকে। সেরাজনগর এম এ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ভাষাসৈনিক মহিউদ্দিন আহমদ এর মতে ১৯৬৪ সালে নরসিংদী শহরের ঐতিহ্যবাহী সাটিরপাড়া স্কুল প্রাঙ্গণে গড়ে তোলা হয় আরেকটি শহীদ মিনার। স্বাধীনতা লাভের পর শহীদ মিনার পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭২ সালে সেই সময়কার শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী নরসিংদী সরকারি কলেজের শহীদ মিনারটিকেই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করে এটিকেই শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হিসেবে ঘোষণা করেন। ঐতিহ্যবাহী নরসিংদী সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণের শহীদ মিনারকে এতদিন ছাত্র-শিক্ষক ও প্রশাসনের সর্বস্তরের লোকজন নরসিংদীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হিসেবে জেনে আসলেও বিগত এক বছরের ব্যবধানে জেলা প্রশাসক ও পৌর মেয়র শহরে আরো দুটি শহীদ মিনার নির্মাণ করেছেন। একুশের মহান শহীদের স্মরণে বর্তমানে নরসিংদী জেলার প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে।


ভাষা আন্দোলনের সফলতার পর্বে নরসিংদীর রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। একুশের চেতনা বাস্তবায়নে বাংলা ভাষার বিকাশে নরসিংদীর কৃতী সন্তানদের অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে। ভাষাবিদ ও ভাষা বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান , অধ্যাপক ড. সফিউদ্দিন আহমদ বাংলা ভাষার একনিষ্ঠ গবেষক হিসেবে আজ শুধু নরসিংদী নয় উপমহাদেশেরও গর্ব। গ্রন্থবিজ্ঞানী ও লেখক মনোহরদীর মোহাম্মদ সা’দত আলী উপমহাদেশ তথা বাংলা ভাষাভাষীদের ইতিহাসে প্রথম বাংলাভাষায় গ্রন্থ বিজ্ঞানের বই রচনা করে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। বাংলাভাষার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্য নরসিংদীর জনাব শাহাদাৎ হোসেন মন্টু ঘটিয়েছিলেন আরেক বিপ্লব। তিনি পাকিস্তানের মাটিতে বসে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে ছাত্র-ছাত্রীদের কালো ব্যাজ পরিয়েছিলেন। মিছিল করেছেন এবং শহীদ দিবস উদযাপন করেছেন। তিনি তখন পাকিস্তানের লাহোরে অধ্যয়নরত এবং `East Pakistan Student Association' এর সভাপতি ছিলেন। এই ঘটনা তখন পাকিস্তানে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং পত্র-পত্রিকা ও জনমনে ব্যাপক তোলপাড় হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে নরসিংদীর আরেক কৃতী সন্তান সাবির আহমেদ চৌধুরীর পাকিস্তানের মাটিতে সর্ব পাকিস্তানী নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের এক সভায় বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেন। পশ্চিম পাকিস্তানের করাচির ইন্টার কন্টিন্যান্টাল হোটেলে অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে নির্মাতা ফয়েজ আহমদের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করেন। উক্ত অনুষ্ঠানের কার্যবিবরণীতে শুধু উর্দু এবং ইংরেজি ভাষাতে বক্তৃতা দেয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু সাবির আহমেদ বাংলা ভাষাকে যুক্ত করার দাবি উত্থাপন করেন। উক্ত সভায় তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে বাংলা ভাষায় বক্তব্য রেখেছিলেন। উক্ত ঐতিহাসিক ঘটনাটি ছিল ভাষা-আন্দোলনের সফলতার পর্বের এক বিরাট বিজয়। ভাষাসংগামীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো :


ফজলুর রহমান ভূইয়া : ১৯২৩ সালের ১৪ আগস্ট ফজলুর রহমান ভূইয়া নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানার অন্তর্গত চরমান্দলিয়া গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম- জহির উদ্দিন ভূইয়া। তাঁর পিতা নিজ এলাকার একজন খ্যাতনামা শিক্ষক (পণ্ডিত) হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। ফজলুল রহমানের পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানার তারাকান্দি গ্রামে।


সাবির আহমেদ চৌধুরী: ভাষাসংগ্রামী সাবির আহমেদ চৌধুরী ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ৩১ আষাঢ় (১৯২৪ সালের ১৫ জুলাই) ঐতিহ্যবাহী নরসিংদী জেলার অন্তর্গত তৎকালীন মনোহরদী থানার (বর্তমান বেলাব) হাড়িসাঙ্গান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।


আলাউদ্দিন আল আজাদ : ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন আল আজাদ বাংলাদেশের শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ১৯৩২ সালের ৬ মে নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার রামনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম- গাজী আবদুস সোবহান এবং মাতার নাম- আমেন খাতুন।


রাজি উদ্দিন ভূইয়া : নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানার বিলাগী গ্রামে এক প্রখ্যাত জমিদার পরিবারে ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল শরাফত আলী ভূইয়া। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন।


অধ্যাপক জোহরা বেগম কাজী : অধ্যাপক জোহরা বেগম কাজী ভারতের মধ্য প্রদেশের রাজনানগাঁও-এ ১৯১২ সালের ১৫ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস মাদারীপুর জেলার কালকিনী থানার গোপালপুর গ্রামে আর স্বামীর ভিটে নরসিংদী জেলার হাতিরদিয়াতে। তাঁর পিতার ডা. কাজী আব্দুস ছাত্তার, মাতা মোসাম্মৎ আঞ্জুমান নেছা ছিলেন নিষ্ঠাবান শিক্ষিত মহিলা। প্রচারবিমুখ মানবতাবাদী এই যুগশ্রেষ্ঠ বাঙালি নারী ২০০৭ সালের ৭ নভেম্বর পরলোকগমন করেন।


অ্যাডভোকেট মো. আবদুল মজিদ : বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক মরহুম অ্যাডভোকেট মো. আবদুল মজিদ, পিতা- মৌলভী শুকুর মাহমুদ সরকার। গ্রাম- ব্রাহ্মণহাটা মনোহরদী থানা: জেলা- নরসিংদী। তিনি ১৯২১ সনের ১৬ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৮৮৭ সনের ১ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।


মো. কমর উদ্দিন সরকার : মো. কমর উদ্দিন সরকার বি.এ (সম্মান), এম.এ (অর্থনীতি) ইপি এস এস ১৯৩১ সালে খিদিরপুর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম মফিজ উদ্দিন সরকার। ৩০ মে ১৯৯৬ বার্ধক্যজনিত কারণে ৬৬ বৎসর বয়সে তিনি পরলোকগমন করেন।


ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ আলী : ১৯৩৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নরসিংদীর দত্তপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম দেলোয়ার আলী। সাবেক সচিব ।


ডা. ফজলুল করিম পাঠান : ডা. ফজলুল করিম পাঠান ১৯২৩ সালের ১৫ এপ্রিল ভারতের পান্ডুয়াতে জন্মগ্রহণ করেন তার পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার পলাশ থানার সুলতানপুর গ্রামে। তার পিতার নাম নজর আলী পাঠান এবং মাতার নাম তাহেরুন্নেছা খাতুন। এই মহান চিকিৎসক ও ভাষাসৈনিক ডা. ফজলুল কমি পাঠান ১৯৯৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।


আফছার উদ্দিন সরকার : নরসিংদী থানার নরসিংদী পৌরসভার অন্তর্গত দত্তপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তারঁ পিতার নাম মরহুম জনাব হোছেন আলী সরকার।


মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান : মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান ৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৯ সালে নরসিংদীর বেলাব উপজেলার বটেশ্বর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ হানীফ পাঠান, মাতার নাম মেহেরুন্নেছা।


ডা. সাদাত আলী শিকদার : ডা. সাদাত আলী শিকদার ১৯২৯ সালে ২৯ জুলাই আড়াইহাজার উপজেলার রামচন্দ্রদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কুদরত আলী শিকদার এবং মাতার নাম খোদেজা খাতুন।


ভাষাসংগ্রামী খোরশেদ আলম : ভাষাসংগ্রামী খোরশেদ আলম-এর জন্ম ১৯৩৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর নরসিংদী জেলার রায়পুর থানার বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর নগর গ্রামে। পিতার নামঃ মৌলভী আবদুস সামাস, মাতার নামঃ সৈয়দা মোবারুকুন্নেছা।


আবদুল করিম পাঠান : আবদুল করিম পাঠান ১৯৩০ সালের ১ এপ্রিল ময়মনসিংহের গোপালপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক ভিটা নরসিংদী জেলার পলাশ থানার সুলতানপুর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম- নজর আলী পাঠান এবং মাতার নাম- তাহেরুন্নেছা খাতুন।


ড. হাবিবা খাতুন : প্রফেসের ড. হাবিবা খাতুন নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানার বিশিষ্ট কৃষিবিদ মোহাম্মদ আবদুল খালেক সাহেবের স্ত্রী।


মোসলেহ উদ্দিন ভূইয়া : মোসলেহ উদ্দিন ভূইয়া নরসিংদী রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর একজন দক্ষ সৈনিক হিসেবে প্রায় অর্ধশতাব্দী ব্যাপৃত ছিলেন। জন্ম ১৯২৯, মৃত্যু ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮। জন্মস্থান দত্তপাড়া, নরসিংদী। বাবা আফসার উদ্দিন ভূইয়া, মা রেশমা বেগম।


ভাষাসৈনিক মোখলেছুর রহমান : ভাষাসৈনিক মোখলেছুর রহমান ১৯২৪ সালের ১৮ এপ্রিল বরিশালের মুলাদিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস নরসিংদী জেলায় চিনিশপুর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম- মৌলভী আশলাফ আলী ভূইয়া বিএবিটি, মাতার নাম- আশরাফিয়া খাতুন।


আব্দুর রাজ্জাক ভূইয়া : আব্দুর রাজ্জাক ভূইয়া একজন বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক, সংস্কৃতিসেবী ও রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি। তিনি মুক্তিযুদ্ধে একজন বলিষ্ঠ সংগঠকও বটে। তিনি দত্তপাড়া, নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী ভূইয়া পরিবারে ১ জানুয়ারি ১৯২৭ সাল জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আজমত আলী ভূইয়া ও মা রূপচান বিবি। আব্দুর রাজ্জাক ভূইয়া আগস্ট ১৯৯৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।


মোহাম্মদ হানীফ পাঠান : আমাদের লোক সংস্কৃতি অঙ্গনের একটি সুপরিচিত নাম মোহাম্মদ হানীফ পাঠান। নিভৃতচারী এ ব্যক্তি ১৯০০ সালের ৮ এপ্রিল বটেশ্বর বেলাবতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৮৯ সালের ২৫ মে বটেশ্বরেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন।


আবুল হাসিম মিয়া : আবুল হাসিম মিয়া, নরসিংদী এলাকার বাম রাজনীতির অন্যতম প্রবক্তা। তার রাজনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। নরসিংদীর অবিসংবাদিত নেতা সুন্দর আলী গান্ধী তার চাচা। সে সূত্রে শৈশবেই তিনি সর্বভারতীয় বহু নেতার সাহচর্য লাভ করেন। ১৯৪২ সালে আবুল হাসিম মিয়া দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। আবুল হাশিম মিয়া ১৯৯৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৭৯ বছর বয়সে প্রাণত্যাগ করেন।


মহিউদ্দিন আহমদ : ভাষাসংগ্রামী ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মহিউদ্দিন আহমদ-এর পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার আদিয়াবাদ গ্রামে।


প্রিন্সিপাল আবদুস শহীদ : প্রিন্সিপাল আবদুস শহীদ ১৯৩৬ সালের ৩০ জুন নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানার বীর আহম্মদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম- হাজী আবদুস সোবহান কারার এবং মাতার নাম- আকিমুন্নেছা।


নবিউল হক রিকাবদার : ভাষাসংগ্রামী নবিউল হক রিকাবদার নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার খড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।


মোহাম্মদ আলীর : ভাষাসংগ্রামী মোহাম্মদ আলীর জন্ম ১৯৩৯ সালের ১৮ জুলাই নরসিংদীর রায়পুরা থানার আদিয়াবাদ গ্রামে। পিতার নাম আবদুল হাফিজ প্রধান।


আবদুল গফুর মাস্টার : শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক, ভাষাসংগ্রামী আবদুল গফুর মাস্টার ১৯২৯ সালে নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলার ধুকুন্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মো: ইছব আলী, মাতার নাম নুরজাহান বেগম। ভাষাসৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আব্দুল গফুর মাস্টার ১৯৯৯ সালে ২৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।


আবদুল করিম মিয়া : আবদুল করিম মিয়া ১৯০২ সালের ২৫ এপ্রিল নরসিংদী সদরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ইয়াসিন বেপারী এবং মাতার নাম কুলসুম বিবি। মরহুম আবদুল করিম মিয়া ৭২ বৎসর বয়সে ১৩৮১ বাংলা ৪ বৈশাখ, ১৯৭৪ ইং সালের ১৮ এপ্রিল তারিখে মৃত্যুবরণ করেন।


মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ : নরসিংদীর শহীদ বুদ্ধিজীবী, ভাষাসংগ্রামী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবদুল হামিদ ছিলেন রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি। ১৯৭১ সালে ৫ মে পাকসেনারা তাকে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে।
নুরুল ইসলাম মোল্লা : নুরুল ইসলাম মোল্লা ১৯৩৫ সালে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার চরনিলক্ষী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।


শহীদউল্লাহ ভূইয়া : নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানার বিন্ন্যাবাইদ গ্রাম ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে এক সন্ত্রান্ত পরিবারে শহীদউল্লাহ ভূইয়া জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আলহাজ্ব বুলন ভুইয়া। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে এই জনদরদী নেতা পরলোকগমন করেন।


মো. আলতাফুর রহমান : ভাষাসংগ্রামী মো. আলতাফুর রহমান ১৯৩৪ সালে ১৭ জানুয়ারি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বর্তমান বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর নগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মৌলভী আবদুস সামাদ এবং মাতার নাম সৈয়দা মোবারুকুন্নেছা। তিনি ২১ মার্চ ২০১৩ ইং তারিখে মৃত্যুবরণ করেন।


এস.এম. চান মিয়া :ভাষাসংগ্রামী এস.এম. চান মিয়া আড়াইহাজার উপজেলার গোপালদীতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের ৩ মাস পর পিতা কেরামত আলী ও মাতা সায়েদুন্নেছাসহ সপরিবারে নরসিংদী এসে স্থায়ী নিবাস স্থাপন করেন। ভাষাসংগ্রামী এস.এম চান মিয়া ২০০৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।


মো. ইয়াকুব আলী আওরঙ্গজেব : ভাষাসংগ্রামী মো. ইয়াকুব আলী আওরঙ্গজেব-এর জন্ম ২ মার্চ ১৯৪১ গ্রাম- চন্দনবাড়ি, থানা- মনোহরদী, জেলা- নরসিংদীতে। পিতা- মৌলভী মো. নোয়াব আলী, মাতা- মোছা. রহিমা বেগম।


বিজয় ভূষণ চ্যাটাজী : কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের অগ্রসেনানী, সাবেক সংসদ সদস্য, ভাষাসৈনিক বিজয় ভূষণ চ্যাটার্জী ১৯১০ সালে নরসিংদীর জিনারদী, পলাশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম রাজমোহন চ্যাটার্জী এবং মাতার নাম সরলাদেবী। ভাষাসংগ্রামী বিজয় চ্যাটার্জী ১৯৭৯ সালের ১৩ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।


ফরিদ উদ্দিন সরকার : ভাষাসংগ্রামী ফরিদ উদ্দিন সরকার ১৯২৮ সালে নরসিংদী সদরের দত্তপাড়া সরকার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম কাজিমুদ্দিন সরকার। ভাষাসৈনিক ফরিদ উদ্দিন সরকার ১৯৯৩ সালের ২৪ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।


কাজী জহিরুল হক : ভাষাসংগ্রামী কাজী জহিরুল হক ১৯৩০ সালের ১ জুন নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার পীরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী নায়েব আলী। ত্যাগী, সৎ ও আদর্শ এই রাজনীতিবিদ ১৯৮৬ সালের ২ জুন মৃত্যুবরণ করেন।


মো. আবদুর জব্বার মাস্টার : মো. আবদুর জব্বার মাস্টার ১৯৩৪ সালের ৭ জুন মনোহরদী উপজেলার বীর আহম্মদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম আল হেলালী এবং মাতার নাম খতিজান বিবি। ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে আবদুল জব্বার মাস্টার মৃত্যুবরণ করেন।


মো. সিরাজুল হক : ভাষাসংগ্রামী মো. সিরাজুল হক ১৯৩৪ সালের ১ মার্চ বর্তমানে মনোহরদী পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের হাররদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হাজী আজিম উদ্দিন মুন্সি, মাতার নাম রোকাইয়া খাতুন। ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।


মো: মোমেনুল হক : মো: মোমেনুল হকের জন্ম ১৯৪৪ সালে নরসিংদী জেলার শিবপুর থানার খড়িয়া গ্রামে।
ডা. সন্তোষ কুমার দাস: ডা. সন্তোষ কুমার দাস নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার রামপুর গ্রামে ১৯৪০ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা রাজনীকান্ত দাস ছিলেন অত্র এলাকার শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তারঁ মাতার নাম স্বরসতী দাস।

লেখক : গবেষক ও চেয়ারম্যান , নরসিংদী প্রেসিডেন্সি কলেজ । ০১৭১৭৩২৪৯৭৫


বিভাগ : মতামত