রায়পুরার চরাঞ্চলে কৃষিকাজে করোনায় ফেরা প্রবাসীরা 

১২ জুলাই ২০২১, ১২:০৮ পিএম | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২১, ১২:০৩ পিএম


রায়পুরার চরাঞ্চলে কৃষিকাজে করোনায় ফেরা প্রবাসীরা 

আসাদুজ্জামান রিপন:
পুরোদমে কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও অন্যান্য পেশায় ঝুঁকেছেন করোনা পরিস্থিতির কারণে দেশে ফেরা নরসিংদীর রায়পুরার চরাঞ্চলের নিলক্ষা ইউনিয়নের প্রবাসীরা। এতে পতিত পড়ে থাকা শত শত হেক্টর কৃষিজমিতে নতুন করে আবাদ শুরু হয়েছে। এতে ফসল উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি বেকারত্ব ঘুচেছে ফেরত আসা অনেক প্রবাসীর।

জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা জানান, রায়পুরা উপজেলার চরাঞ্চলের কর্মক্ষম উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ প্রতিবছরই পাড়ি জমিয়ে থাকেন বিশে^র বিভিন্ন দেশে। রায়পুরা উপজেলার চরাঞ্চলের ৮টি ইউনিয়নের বেশিরভাগ মানুষ প্রবাসী হওয়ায় আগ্রহ কম ছিল কৃষিকাজে। এছাড়া উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ কম হওয়া ও কৃষি শ্রমিক সংকটসহ নানা কারণে ফসল আবাদ থেকে সরে আসেন চরের কৃষকরা। এতে পতিত হয়ে পড়ে শত শত হেক্টর কৃষিজমি। অনেকে কৃষি কাজ না থাকায় বাধ্য হয়েও বিদেশে পাড়ি দিয়ে থাকেন।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, রায়পুরা উপজেলার চরাঞ্চলের বিভিন্ন ইউনিয়নে মোট আবাদী কৃষি জমির পরিমান ৪ হাজার ৮২৭ হেক্টর। এরমধ্যে নিলক্ষা ইউনিয়নে মোট জমির পরিমান ৭৭৫ হেক্টর জমি বিস্তীর্ন চরাঞ্চল। মাটি উর্বর হওয়ায় চরাঞ্চলের এসব জমিতে ধান, মরিচ, আলু, বাদাম, তিল, ভুট্ট্রা, বাঙ্গি, ওস্তে, কুমড়াসহ বিভিন্ন ফসলের ভাল ফলন হয়।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, সার, কীটনাশক, জ্বালানী তেলসহ কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ কম হওয়ায় দিনদিন ফসল আবাদ থেকে সরে পড়েন চরাঞ্চলের বেশিরভাগ কৃষক। কৃষি কাজ ছেড়ে বিদেশ গমনের প্রবণতা বাড়ায় স্থানীয়ভাবে সংকট দেখা দেয় কৃষি শ্রমিকেরও। শ্রমিক পাওয়া গেলেও মজুরি দিতে হয় বেশি। এতে বাড়তি খরচ দিয়ে ফসল চাষ করে অব্যাহত লোকসান গুনতে হয় কৃষকদের। এতে পতিত হয়ে পড়ে নিলক্ষার চরাঞ্চলের আড়াইশত হেক্টর কৃষি জমি। বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা ও লোকসানের কারণে চাষাবাদ না করায় একইভাবে এই উপজেলার আরও ৭টি চরাঞ্চলীয় ইউনিয়ন বাশঁগাড়ী, মির্জারচর, পাড়াতলী, চাঁনপুর, শ্রীনগর, চর মধুয়া ও চর আড়ালিয়ায় প্রতি বছর বাড়তে থাকে অনাবাদী কৃষি জমির পরিমাণ। চরাঞ্চলের এসব জমিতে চাষাবাদ না করায় পতিত পড়ে থাকে মাঠের পর মাঠ জমি।

সরেজমিন নিলক্ষা ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, করোনা পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হতে দেশে ফেরত আসা প্রায় একশত প্রবাসীর অনেকেই বিভিন্ন পেশা আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এরমধ্যে বেশিরভাগ প্রবাসী পুনরায় ফিরেছেন কৃষিকাজে। কেউ নিজের জমি কেউ অন্যের জমি চুক্তিতে নিয়ে চাষাবাদ শুরু করেছেন। পুরোদমে কৃষিকাজে মনোযোগী হওয়ায় ফসলে ফসলে ভরে উঠেছে চরাঞ্চলের পতিত এসব জমি। এছাড়া ধানের ন্যায্য মূল্য পাওয়ায় অন্যান্য কৃষকরাও ধান চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। শুধু নিলক্ষা ইউনিয়ন নয়, একইভাবে অন্য ৭টি চরাঞ্চলীয় ইউনিয়নেও কৃষিকাজে মনোযোগী হয়েছেন প্রবাস ফেরতরা। কৃষিকাজ ছাড়া অনেকে ইজিবাইক চালিয়ে, কেউ কেউ মেঘনা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

নিলক্ষা ইউনিয়নের গোপীনাথপুর গ্রামের মালয়েশিয়া ফেরত শাহিন মিয়া বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে আসতে হয়েছে। আর যেতে পারবো কী না বুঝতে পারছি না। দেশে বেকার না থেকে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে ধান ও আলু চাষ করেছি। আমার মত অনেকেই কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন।

একই এলাকার অপর মালয়েশিয়া ফেরত প্রবাসী সাগর আহমেদ বলেন, ছুটিতে দেশে আসার পর তিনমাসের মধ্যে ফিরে যাবার কথা ছিল কিন্তু করোনার কারণে যেতে পারছি না। বাধ্য হয়ে এখন কৃষিকাজ করছি। আগে জমি পতিত থাকলেও এখন আর আগের মতো কোন জমি পতিত নেই।

মালয়েশিয়া প্রবাসী আক্তার মিয়া বলেন, আমাদের নিলক্ষা ইউনিয়নের ৭ গ্রামের বৈধ অবৈধ মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষ মালয়েশিয়া, কুয়েত, সৌদী আরব, ওমান, আবুধাবিতে থাকেন। এরমধ্যে শতাধিক প্রবাসী দেশে ফিরে কৃষিকাজ, মাছ ধরাসহ অন্যান্য কাজে যুক্ত হয়েছেন।

মালয়েশিয়া ফেরত সাদ্দাম হোসেন বলেন, গত বছরে ফেব্রুয়ারি মাসে ছুটিতে দেশে ফিরে করোনার কারণে আর যেতে পারছি না। এখন ইজিবাইক কিনে চালিয়ে সংসার চালাচ্ছি।

আমির হোসেন বলেন, মালয়েশিয়া না ফিরতে পেরে নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছি। আমার মত অনেকেই মাছ ধরাসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়েছেন। কেউ কেউ ছোটখাট ব্যবসাও করছেন।

রায়পুরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বনি আমিন খান বলেন, আগে ন্যায্য মূল্য না পেয়ে লোকসানের কারণে ও বিদেশে যাওয়ার প্রবণতার কারণে চরাঞ্চলের অনেক জমি পতিত থাকতো। বর্তমানে ধানের মূল্য পাওয়াসহ করোনার কারণে ফিরে আসা ও আটকে পড়া প্রবাসীরাও কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন। এতে চরাঞ্চলের জমিগুলো ফসলে ভরে উঠেছে। এতে চলতি বছর নিলক্ষাসহ অন্যান্য চরাঞ্চলীয় ইউনিয়নে কোন জমি পতিত নেই।

তিনি আরও জানান, নিলক্ষা ইউনিয়নে মোট জমির পরিমান ৭৭৫ হেক্টর, এরমধ্যে সবজমিতেই বিভিন্ন ফসল আবাদ হয়েছে। ৪ বছর আগেও এই এলাকাসহ অন্যান্য চরাঞ্চলে বেশিরভাগ জমি পতিত ছিলো।