বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও আমাদের শিক্ষক সমাজ

০৫ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:১৪ এএম | আপডেট: ২৫ জানুয়ারি ২০২০, ০২:৩০ পিএম


বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও আমাদের শিক্ষক সমাজ


ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন


৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্র শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ প্রতিবছর পালন করা হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এই দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় : তরুন শিক্ষক : পেশার ভবিষ্যৎ (“ণড়ঁহম ঞবধপযবৎং: ঞযব ভঁঃঁৎব ড়ভ চৎড়ভবংংরড়হং”. )। আমাদের দেশে বিশ্ব শিক্ষক দিবস রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হয় না। অথচ আইএলও ও ইউনেস্কোর বিশ্ব শিক্ষক দিবস প্রস্তাবনায় বাংলাদেশ সম্মতি স্বাক্ষর করেছে। শিক্ষক সংগঠনগুলোও এই দিবসটি পালনে তেমন আগ্রহ বা গুরুত্বের সাথে পালন করেনি।

সরকারি বেসরকারিভাবে নেই কোন উদ্যোগ বা কর্মপরিকল্পনা। অথচ প্রতিবছর শিক্ষক দিবসের চেয়েও কম গুরুত্বপূর্ণ দিবস সমূহ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে পালিত হয়ে থাকে। জাপানের একটা প্রচলিত প্রবাদ হলোঃ ‘ইবঃঃবৎ ঃযধহ ধ ঃযড়ঁংধহফ ফধুং ড়ভ ফরষষরমবহঃ ংঃঁফু রং ড়হব ফধু রিঃয ধ মৎবধঃ ঃবধপযবৎ’।

পৃথিবীর সকল দেশের শিক্ষক সমাজের নিকট এ দিনটি অত্যন্ত গৌরব ও মর্যাদার। তবে শিক্ষক দিবস পালনের ইতিহাস খুব বেশিদিন আগের নয়। দেশের অগণিত শিক্ষকদের আদর্শগত মহান কর্মকাণ্ডের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাঁদের পেশাগত অবদানকে স্মরণে-বরণে শ্রদ্ধায় পালন করার জন্য সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই মহান শিক্ষক পালন করার রীতি রয়েছে। নির্দিষ্ট দিনটি বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে পালন করা হয়ে থাকে।

যেমন বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়। টঘওঈঊঋ থেকেও, ৫ অক্টোবর দিনটিই বিশ্ব শিক্ষক দিবসের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইউনেস্কো এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে- তরুন শিক্ষক , পেশার ভবিষ্যৎ এ বছর সংস্থাটির সদস্যভুক্ত ১০০ দেশে ৪০১টি শিক্ষক সংগঠন দিবসটি উদযাপন করছে। আবার বিশ্বের অন্য ১১টি দেশে ২৮ ফেব্র“য়ারি দিনটিতে বিশ্ব শিক্ষক দিবস চালু। দেশগুলি হল মরক্কো, আলজেরিয়া, টিউনেশিয়া, লিবিয়া, ইজিপ্ট, জর্ডন, সৌদিআরব, ইয়েমেন, বাহরেইন, ইউ এ ই, ওমান। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকরা তাদের বিভিন্ন দাবী বাস্তবায়ন না করতে পেরে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।

স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো, অষ্টম বেতন কাঠামোয় সর্বোচ্চ বেতন ও পদমর্যাদা নিশ্চিতকরণের এ আন্দোলনে এখনো রাজপথে শিক্ষকরা। সরকারের পক্ষ থেকে এখনো ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি শিক্ষকদের জন্য। এসবের মধ্যে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আজ শনিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস।

১৯৯৩ সালে বিশ্বের ১৬৭টি দেশের ২১০ টি জাতীয় সংগঠনের প্রায় ৩ কোটি বিশ লক্ষ সদস্যদের প্রতিনিধিত্বকারী আন্তর্জাতিক শিক্ষক সংগঠন “ এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল” গঠিত হয়, এ আন্তর্জাতিক সংগঠন জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলো কর্তৃক প্রণীত দলিলটি যথাযথ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করার অর্থবহ উদ্যোগ গ্রহণের জন্য ক্রমাগত অনুরোধ ও আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইউনেস্কোর মহা-পরিচালক ড. ফ্রেডারিক এম মেয়রের যুগান্তকারী ঘোষণার মাধ্যমে ৫ অক্টোবর “ বিশ্ব শিক্ষক দিবস” পালনের শুভ সূচনা করা হয়।

১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর থেকে ইউনেস্কো দ্বারা বিশ্ব শিক্ষক দিবস দিনটি সূচিত হয়। এটি সারা দেশ-বিদেশে শিক্ষক পেশাজীবীদের জন্য সেরা সম্মান। পরবর্তী প্রজন্মও যাতে কার্যকরী ও যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে এই দিনটি পালন করে সেটাও উদ্দেশ্য। এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল মনে করে, জাতীয়স্তরে সমগ্র বিশ্বেই একটি বিশেষ দিনকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি যেটি সমাজ-সংস্কার-শিক্ষায় শিক্ষকদের উপযুক্ত মান্যতা দান করার যোগ্য দিন।

১৯৯৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই যথাযোগ্য মর্যাদায় বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা স¤পর্কিত সাফল্যকে সমুন্নত রাখাসহ আরো সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে ১৯৯৫

সালের ৫ই অক্টোবর থেকে বিশ্বের ১০০টি দেশে এই দিবসটি পালিত হয়ে থাকে।

এই দিবসটি পালনে এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল (ঊফঁপধঃরড়হ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ - ঊও) ও তার সহযোগী ৪০১টি সদস্য সংগঠন মূল ভূমিকা রাখে। দিবসটি উপলক্ষে ইআই প্রতি বছর একটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে থাকে যা জনসচেতনাতা বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষকতা পেশার অবদানকেও স্মরণ করিয়ে দেয়। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদন্ড হয় তবে শিক্ষকরা সে মেরুদন্ডের স্রষ্টা। গোটা মনুষ্য সমাজের মধ্যে নৈতিকবিচারে শিক্ষকদের চেয়ে সম্মানিত এবং শিক্ষকতার চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পেশা আর একটাও নাই।

শিক্ষকরা এ সমাজের প্রাণ। তাই পৃথিবীতে যতগুলো সম্মানজনক পেশা আছে তার মধ্যে শিক্ষকতা সর্বোচ্চ সম্মানিত পেশা। মানুষের মধ্যে যারা কৃতজ্ঞ শ্রেণীর তারা সার্বিকভাবে না হলেও ব্যক্তিগতভাবে কোন না কোন শিক্ষকের কাছে ঋণী এবং বিভিন্ন সভা সেমিনারে তাদের সে অভিব্যক্তিও ফুটে ওঠে। সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও শিক্ষকতা একটি মহান পেশা হিসেবে স্বীকৃত।

তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মানসম্মত শিক্ষা। বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফলে পাশের অধিক্য বাড়লেও গুনগত মান নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। তাই মানসম্মত শিক্ষাদানের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষতা স¤পন্ন শিক্ষক দ্বারা সকল শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান নিশ্চিত করতে হবে। এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল (ঊফঁপধঃরড়হ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ - ঊও) মানসম্মত শিক্ষার মূল উপাদান হিসেবেঃ

১) মানসম্মত শিক্ষক
২) মানসম্মত শিক্ষা উপকরণ ও
৩) মানসম্মত পরিবেশ নির্ধারণ করেছে।

তবে আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম, পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্যশিক্ষক, প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষাদান সামগ্রী ও ভৌত অবকাঠামো যথার্থ শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি, কার্যকর ব্যবস্থাপনা , তত্ত্বাবধান এবং গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ ও উপযুক্ত মূল্যায়ন ব্যতীত এ লক্ষ্য অর্জন পুরোপুরি সম্ভব নয়।

গত চার দশকে শিক্ষকদের অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে, এটা ঠিক। তবে সময় ও বিশ্বের তুলনায় এটা এখনো আশাব্যঞ্জক হয়নি। এখন মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসছে না। প্রবীণ দক্ষ শিক্ষকরা বিদায় নিচ্ছেন, কিন্তু এসব শূন্যস্থান যথাযথভাবে পূরণ হচ্ছে না। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা শিক্ষকরা সমাজ, রাষ্ট্রের আলোকবর্তিকার মত কাজ করবে।

শিক্ষকদের কাছে সমাজের প্রত্যাশা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে শিক্ষকদের প্রত্যাশা, মান মর্যাদা নিয়ে শিক্ষকদের বেঁচে থাকার আকুতি এবং তা নিশ্চিতকরণে সমাজের কাছে তাদের দায়বদ্ধতা, শিক্ষকতার মতো মর্যাদাপূর্ণ পেশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ঘনিষ্ঠ আচরণ কতটুকু সম্ভব হচ্ছে, তার যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন। তাই শিক্ষকদের পেশাগত স্বীকৃতি, সম্মানজনক বেতন, পেনশন, সামাজিক প্রাপ্তি ও চমৎকার কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকরা হলেন শিক্ষার নিয়ামক শক্তি। তাঁদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবেই। তবে শিক্ষকদেরও নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করতে হবে। অভীষ্ট সফলতার জন্য শিক্ষকদের পর্যাপ্ত ক্ষমতায়ন নিশ্চিতসহ সকল স্তরে শিক্ষক সংকট দূর করতে হবে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত গ্রহণযোগ্য পর্যায় আনতে হবে।

বাংলাদেশের শিক্ষকদের অবস্থা স¤পর্কে আলোকপাত করার পূর্বে আসুন দেখে নেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষকের অবস্থান। ঞযব এঁধৎফরধহ পত্রিকায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চীনের শিক্ষকরা সেদেশের সকল নাগরিকের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মান পেয়ে থাকেন। চীনে একজন ডাক্তার যে সুবিধা ভোগ করেন, একজন শিক্ষক তার কাছাকাছি সুবিধা ভোগ করেন। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাস্ট্র,তুরস্ক, গ্রীস, দক্ষিণ কোরিয়া, মিশর প্রভৃতি দেশের শিক্ষকরা সর্বোচ্চ মুল্যায়ন পেয়ে থাকেন।

বৃটেনের প্রধান শিক্ষকরা যে মুল্যায়ন পেয়ে থাকেন, পৃথিবীর আর কোথাও তা নেই। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক এবং মিশরের বাবা-মারা তাদের সন্তানদেরকে শিক্ষক হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশী উৎসাহ দিয়ে থাকেন। সিঙ্গাপুরের শিক্ষকরা পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ বেতন পেয়ে থাকেন। তাদের বেতন গড়পড়তায় ৪৫,৭৫৫ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৩৬ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা); মাসিক হিসেবে তিন লক্ষ টাকার চেয়েও বেশি।

দক্ষিণ কোরিয়া,যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানী এবং জাপানে শিক্ষকদের বেতন ৪০,০০০ মার্কিন ডলারের (বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৩২ লক্ষ টাকা) চেয়ে বেশী, যা মাসিক হিসেবে প্রায় ২ লক্ষ ৬৭ হাজার টাকা। আর বৃটেনে শিক্ষকরা পান ৩৩,৩৭৭ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ২৬ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা) ; মাসিক হিসাবে প্রায় ২ লক্ষ ২৩ হাজার টাকা।
এবার আসা যাক বাংলাদেশ প্রসঙ্গে।

আমাদের দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সরকারিভাবে পরিচালিত হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা উত্তর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের প্রায় ৩৭ হাজার প্রাইমারি স্কুল জাতীয়করণ করেছিলেন এবং তার সুযোগ্য উত্তরসূরী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো ২৬১৯৩টি প্রাইমারি স্কুল , সাম্প্রতি প্রায় ৩০০ হাই স্কুল, কলেজ জাতীয়করণ করেন। পিতা ও কন্যার ঐকান্তিক প্রচেস্টায় আজ দেশের প্রাথমিক শিক্ষা স¤পুর্ণরুপে সরকারি।

১৯৮০ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন সরকার শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেলভুক্ত করে বেতনের ৫০ ভাগ সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ধাপে ধাপে মূল বেতনের শতকরা ১০০ ভাগ, বাড়ি ভাড়া পাঁচগুণ, চিকিৎসা ভাতা দ্বিগুণ, উৎসব ভাতা (শিক্ষক ২৫ শতাংশ ও কর্মচারী ৫০ শতাংশ) এবং অবসরে আর্থিক সুবিধা বর্তমানে শিক্ষকরা বিলম্বে পেয়ে থাকেন।

বর্তমান সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। বিগত আট বছর ধরে সরকার ১ জানুয়ারিতে (মাধ্যমিক ও সমমানসহ) বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ (২৬০ কোটি ৮৫ লাখ ৯৭ হাজার ৩০২টি) এবং ক্লাস শুরু (১ জুলাই কলেজ) জাতীয় শিক্ষানীতি/১০ প্রণয়ন, পাঠ্যপুস্তকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ, ২৩৩০০ স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, উপজেলায় আইসিটি রিসোর্স সেন্টার স্থাপন, এনটিআরসিএর মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ, পশ্চাৎপদ অঞ্চলে ইংরেজি ও গণিতে ১১ লাখ অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া, শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের আওতায় øাতক পর্যায়ে বৃত্তি, ৬০ দিনে সব পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ, শ্রেণিতে মানস¤পন্ন পাঠদানের সিডি (ঈউ) প্রদান, সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতা, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, মাদরাসার মূল ধারার সঙ্গে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা অন্তর্ভুক্তি বা আধুনিকায়ন, ২০১৫ সালের মধ্যে মানসম্মত শিক্ষা এবং ১০ লাখ শিক্ষকের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ইতোমধ্যে সমাপ্ত করেছে।

বর্তমান সরকারপ্রধান অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের সঙ্গে ২০১৮-১৯ সালে ৪৬৪৫৭৩ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রণয়ন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করেছেন এটি অস্বীকার করার উপায় নেই।

তারপরও একজন প্রাথমিক শিক্ষকের মাসিক গড় বেতন প্রায় ২৫ হাজার টাকা। পক্ষান্তরে দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অবস্থা খুবই করুণ। মাত্র ২% প্রতিষ্ঠান সরকারি আর বাকি ৯৮% প্রতি¯ঠান বেসরকারি। সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট। সরকারি শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেলের মূল বেতনের পাশাপাশি ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি,মূল বেতনের ৪৫-৫০% বাড়িভাড়া, ১৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, মূল বেতনের ১০০% হারে দুটি উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা, শ্রান্তি বিনোদন ভাতা, শিক্ষা ভাতা, টিফিন ভাতা , বদলি সহ নানাবিধ সুবিধা পেয়ে থাকেন।

পক্ষান্তরে, ৯৮% শিক্ষার ভার যাদের উপর অর্পিত,সেই বেসরকারি শিক্ষকরা উপযুক্ত সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সবচেয়ে পীড়াদায়ক যে বিষয়টি সেটি হল, এতদিন এমপিওভূক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের সরকার প্রদত্ত বেতনের সরকারি অংশ” হিসেবে আখ্যায়িত করলেও ফরাস উদ্দিন কমিশন প্রণীত বর্তমান পে কমিশন এমপিওভূক্ত শিক্ষকদের বেতনকে “অনুদান সহায়তা” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। দেশের ৯৮% শিক্ষার দায়িত্ব নিয়ে যারা দিবারাত্র মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বিনিময় স্বরূপ তাদেরকে

অনুদান প্রদান করা- শিক্ষক সমাজের সবচেয়ে বড় অংশের এর চেয়ে বড় অপমান আর কি হতে পারে?

পূর্বে বেসরকারি শিক্ষকদের সারাজীবনে একটি মাত্র ইনক্রিমেন্ট থাকলেও ফরাস উদ্দিন কমিশন সবেধন নিলমণি সেই ইনক্রিমেন্টটি ও বন্ধ করে দিয়েছেন। প্রিন্সিপাল থেকে দপ্তরী পর্যন্ত সবার বাড়িভাড়া মাত্র ১০০০ টাকা, বর্তমান বাজারে যা দিয়ে একটি কুড়েঘরে থাকাও দুস্কর। চিকিৎসা ভাতা মাত্র ৫০০ টাকা,অথচ একজন ডাক্তারের একবারের ভিজিট ও তার চেয়ে বেশী। মূল বেতনের ২৫% বোনাস, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক যে, একজন শিক্ষককে নিজের ও নিজের পরিবার ও আতœীয় স্বজনের চাওয়া পাওয়া মেটাতে না পেরে তাদের কাছে লজ্জিত হওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। পূর্বে একটিমাত্র টাইমস্কেল পেয়ে সারা জীবনে একবার বেতন বৃদ্ধির সুযোগ থাকলেও বর্তমান পে স্কেলে তা বাতিল করা হয়। স্কুল শিক্ষকদের পদোন্নতির কোন সুযোগ নেই।

কলেজ শিক্ষকদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির একটি সুযোগ থাকলেও অনুপাত প্রথা (৫ঃ২) এর কারণে অধিকাংশ প্রভাষককে সারা জীবন একই পদে থেকে অবসরে যেতে হয়। সরকারি স্কুল-কলেজে যে সিলেবাস, সেই একই সিলেবাস পড়িয়ে, সমান যোগ্যতা নিয়ে, স্কুল পর্যায়ের একজন শিক্ষকের বেতন ১২,৫০০- ১৬০০০ টাকা আর কলেজ পর্যায়ে একজন প্রভাষক পান ২২০০০ টাকা। অথচ একজন সরকারি অফিসের পিয়নের বেতনও ২৫০০০ টাকা বা তার চেয়েও বেশি। অনুপাত নিয়ম বাদ দিয়ে প্রয়োজনে পদোন্নতি পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়া হোক ।
একেতো শিক্ষকরা নানামুখী বৈষম্যের শিকার,তার মধ্যে হঠাৎ করে কোনরুপ বিনিময় দেওয়া ছাড়া বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন থেকে অতিরিক্ত ৪% কর্তনের হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগে থেকেই বিক্ষুব্ধ শিক্ষক সমাজ এবার আর সহ্য করতে না পেরে ক্ষোভে ফেটে পড়ে।শিক্ষকরা বুঝতে পারে একমাত্র জাতীয়করণ ছাড়া তাদের দুর্দশা লাঘবের আর কোন উপায় নেই।

উপমহাদেশের দেশগুলো ভারত, ভূটান, নেপাল শ্রীলংকা ইউনেস্কোর সেই দলিলে আমাদের মত শুধু স্বাক্ষর করেনি তারা তা নিজেদের দেশে সীমিত ক্ষমতায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। শিক্ষার ব্যয় এসব দেশে জিডিপির ৭ ভাগ না করলেও তারা ৩-৫ ভাগের মধ্যে সীমিত রাখে এমনকি ৭১ পরবর্তী পাকিস্তান এখন প্রায় ৩ ভাগে কাছাকাছি ব্যয় করছে। গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র ও ১১ দফায় বর্ণিত শিক্ষার মুক্তি প্রত্যয়ে সংগঠিত রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামে বিজয়ের ৪৫ বছর পরেও শিক্ষাখাতে ব্যয় এই পর্যন্ত কখনো ২.৫ ভাগের উপরে উঠেনি।

বিশ্বসংস্থা ইউনেস্কো পৃথিবীর প্রত্যেক দেশের সরকারকে শিক্ষার সার্বজনীন দাবির অধিকার মেটাতে, শিক্ষা সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান মনষ্কতার মেলবন্ধন ঘটাতে, রাষ্ট্রকে শিক্ষার প্রাথমিক দায়িত্ব নেবার সুপারিশ করে। এ লক্ষ্যে শিক্ষার অর্থায়নের জন্য, শিক্ষা খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৭ ভাগ ব্যয় করার সুপারিশ করা হয়। আমাদের মত কিছু দেশ অবশ্য সেই ইউনেস্কোর শিক্ষা সনদে স্বাক্ষর করেও তা কখনো বাস্তবায়ন করেনি। কিন্তু উচ্চ শিক্ষা তথা শিক্ষার অন্যান্য স্তরে মুনাফা কেন্দ্রিক প্রাইভেটাইজেশনের পথে আমাদের দেশ তখনো যায়নি।

শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল। ১৯৭৫ সালের পর আবার বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি প্রায় সব উন্নত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে একেবারে নিচে নামিয়ে আনে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও তেলের মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে দেয়। এ অবস্থায় ধনবাদী দুনিয়া আবারও ফিরে যায় অবাধ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বিহীন অর্থনৈতিক নীতিতে।

বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত, যোগ্যতাস¤পন্ন ও সদ্য পাস করা তরুণ-তরুণীরা আরো বেশি বেতনে বহুজাতিক কো¤পানিতে কাজ করতে আগ্রহী। কিছু ক্ষেত্রে লক্ষণীয়, বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চেয়ে বিসিএস প্রশাসন, কর বা কাস্টমস সার্ভিসে যোগ্যতা অর্জন করলে তা বেছে নেয়া হয়। এটা খুব হতাশার বিষয় যে, শিক্ষা সেক্টর থেকে তরুণ মেধাবীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। রাষ্ট্রের জন্য এটা শুভ হতে পারে না এবং মেধাশূন্য শিক্ষা সেক্টর উদ্বেগের কারণ।প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে যোগ্য তরুণ-তরুণী শিক্ষকতার চেয়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে বেশি আগ্রহী হতে দেখা যায়।

অন্য কোনো ভালো চাকরি না পাওয়ায় তারা মনে হয় যেন, শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে অন্তর থেকে গ্রহণ করেন না। তাই এই পেশাকে আকর্ষণীয় করে তোলা দরকার। উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের শিক্ষকতা গবেষণাধর্মী ও মেধাভিত্তিক। তাই এখানে প্রবেশ ও অবসরের বয়স সীমিত না করে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী যেকোনো শিক্ষকের আজীবন চাকরি করার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে শিক্ষার্থীদের বেতন ও অভ্যন্তরীণ স¤পদ থেকে প্রচুর আয় হয়।

শিক্ষকদের বাড়িভাড়া, চিকিৎসাভাতা এবং অন্যান্য ভাতা এমনভাবে বৃদ্ধি করতে হবে যাতে তারা প্রথম শ্রেণীর সরকারি যেকোনো চাকরি থেকে বেশি আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আর্থিক সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে শিক্ষকতায় মেধাবীদের আগ্রহী করে তুলতে হবে। শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চালু করেও তরুণ-তরুণীদের এ মহান পেশার প্রতি আগ্রহী করে তোলা যায়।পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় এবং সরকারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উচ্চ, বেসরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদান কাজে নিয়োজিত শিক্ষকদের যোগ্যতা তথা মেধার পার্থক্য রয়েছে। তাই তাদের আর্থিক সুবিধার মধ্যেও তারতম্য থাকা স্বাভাবিক।

কিন্তু এমনটি হওয়া কখনো উচিত নয় যে, কেউ জীবিকা নির্বাহে কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হবেন। ¯পষ্ট করে বলতে হচ্ছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের যে বেতন (সরকারের ভাষায় অনুদান) নির্ধারণ করা হয়েছে, তা জীবিকা নির্বাহের জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত। তাই এমপিও শিক্ষকেরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্তির দাবিদার।

আমাদের দেশে শিক্ষার মানসম্মত পরিবেশের অভাব প্রকট। খোলা আকাশের নিচে পাঠদানের চিত্র আমরা বিভিন্ন সময় খবরের কাগজে দেখেছি। ক্ষমতাসীন কর্মীরা শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যাহত করছে। কিন্তু সরকারের সেদিকে দৃষ্টি নেই। কারণ, ভোটের রাজনীতিতে কর্মীদের বিরাট কদর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশেই গড়ে উঠেছে বাজার, সিনেমা হল, ভিডিও গেমস প্রভৃতি। গানবাজনা হৈ-হুল্লোড়ের কারণে শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

কিন্তু শিক্ষকদের এতে করার কিছু থাকে না। তাই স্থানীয় সরকার ও এলাকার নেতৃত্ব এসব সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসতে পারে অথবা পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে সমাধান করা যায়।গোটা দেশের শিক্ষাকার্যক্রম যেন যান্ত্রিক নিয়মে চলছে। দেশের ৯৫ শতাংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উল্লিখিত চার ধরনের সমস্যার সম্মুখীন। সরকারি চাকুরেদের দুই দফা অবসরের বয়স বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকদের বয়স বাড়ানো হয়নি। তাদের প্রত্যাশা ছিল অবসরের বয়স ৬৫ বছর করা হবে। যুক্তিও ছিল।

আগে সরকারি কর্মচরীদের ৫৭ বছর অবসর বয়স ছিল, তখন এমপিওভুক্তদের ৬০ বছর। সরকারিদের তুলনায় তাদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা কম থাকায় সরকার তাদের বয়স বাড়িয়েছিল তিন বছর। অথচ বর্তমান সরকার তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেনি।পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর অসন্তোষ নিয়েই চলছে সরকার। তার প্রতি সরকারের উপহার হলো স্বল্প বেতন ও স্বল্প সময় চাকরি। অশ্র“ভরা নয়নে তাদের শুধু প্রতীক্ষা। তারা পরিবর্তনের প্রত্যাশায় ব্যাকুল। অবসর নেয়ার বয়স ৬৫ বছর করা এবং মানসম্মত মাসিক বেতনভাতার জন্য তারা চেয়ে থাকেন।

গ্রামের শিক্ষকেরা যে বেতনভাতা পেয়ে থাকেন, শহর-নগরের শিক্ষকেরাও তা-ই পান। কিন্তু শহর-নগর জীবন প্রচুর ব্যয়বহুল। তাই শেষোক্ত শিক্ষকরা নগরভাতার প্রত্যাশী। পদমর্যাদায়ও অসন্তোষ। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকেরা যে পদমর্যাদার অধিকারী, উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরাও একই পদমর্যাদার অধিকারী। সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই বলে এ বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

তাই বিশ^ শিক্ষক দিবসে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আশাÑ সব বৈষম্য দূর হবে; শিক্ষকেরা পাবেন নগর-মহানগর ভাতা, উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের শিক্ষকেরা পাবেন পদমর্যাদা, মানসম্মত জীবিকার জন্য মানসম্মত বেতন, অবসর বয়স ৬৫ বছর হবে এবং বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ এবং ২০ শতাংশ বৈশাখী ভাতা তারাও পাবেন। তারা দাবি করেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ভাতা, স্বাধীনতা দিবস ভাতা, বিজয় দিবস ভাতা। কারণ,এ দিনগুলোতে তাদের বাড়তি কাজ করতে হবে। তাদের প্রত্যাশা কি প্রত্যাশাই রয়ে যাবে, নাকি পূরণ হবে?

শিক্ষক স¤পর্কে এ পি জে আবদুল কালাম বলেছিলেন, ‘যদি একটি দেশকে দুর্নীতিমুক্ত এবং সুন্দর মনের মানুষের জাতি হতে হয়, তাহলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এ ক্ষেত্রে তিনজন সামাজিক সদস্য পার্থক্য এনে দিতে পারে। তারা হলেন বাবা, মা এবং শিক্ষক’। অ্যারিস্টটল বলেন-যাঁরা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী তাঁরা অবিভাবকদের থেকেও অধিক সম্মাননীয়। পিতামাতা আমাদের জীবনদান করেন ঠিকই। শিক্ষকরা সেই জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।

একজন মেধাবী শিক্ষার্থী শিক্ষকতা পেশায় তখনই আসবেন যখন তিনি দেখবেন, তাঁর ওপরে ওঠার সিঁড়ি আছে। অর্থাৎ একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যদি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন তাহলে তাঁর মেধার কারণে তিনি যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও হতে পারেন। তাঁকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নতুন করে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার জন্য দৌড়ঝাঁপ ও ছোটাছুটি যাতে করতে না হয়।

যে শিক্ষার্থী বা প্রার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন এবং তিনি যদি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষকতা শুরু করেন, তাহলে আমরা কি চিন্তা করে দেখতে পারি না তাঁর দ্বারা প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা কত বেশি উপকৃত হবে? এই শিক্ষককেই যদি পরবর্তী সময় শিক্ষা বিভাগের মহাপরিচালক করা হয় তাহলে কি আমরা তাঁর কাছ থেকে চমৎকার শিক্ষার পরিবেশ আশা করতে পারি না? এখন কী হয়? একজন কলেজ শিক্ষক শিক্ষা বিভাগের মহাপরিচালক হন।

এখানে অবশ্যই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয় ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এই কলেজের শিক্ষক মহাপরিচালক কোনোভাবেই মাধ্যমিক শিক্ষকদের ব্যথা বুঝবেন না এবং বোঝেনও না।

প্রাথমিক শিক্ষার ভিত হওয়া প্রয়োজন অত্যন্ত মজবুত, অত্যন্ত আকর্ষণীয়, যা সারা জীবন একজন শিক্ষার্থীর মনে থাকবে। প্রাথমিকে শিক্ষার পরে ঝরে পড়লেও ওই শিক্ষার্থীর মনে যেন দাগ কেটে থাকে প্রাথমিকের শিক্ষাকাল। কিন্তু বিশৃঙ্খল এই প্রাথমিক শিক্ষা। অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না হলে একজন শিক্ষক শিক্ষকতা কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন না। তাই প্রাথমিক শিক্ষাকে পুরোপুরি অবৈতনিক করা হয়েছে আমাদের দেশে।

আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি একেবারে কম পাওয়া নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাথমিক শিক্ষা বাংলাদেশে। অথচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আকর্ষণের কোনো কারণই বিদ্যমান নেই। আর বেসরকারিগুলোতে শিক্ষকদের নেই কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ। এ শিক্ষা পেয়েই আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করছে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। সরকারের পক্ষ থেকে ম্যাগনিফাই করে দেখানো হয় শিক্ষা খাতে কী কী করা হয়েছে, কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আর আমরা যারা শিক্ষা নিয়ে চিন্তাভাবনা করি, তারা পত্র-পত্রিকা পাতায় কিছু মতামত তুলে ধরি, কিন্তু সেগুলো থাকে সমাধান থেকে অনেক দূরে। শিক্ষার মান নিয়েও প্রচুর প্রশ্ন। পাসের হার বাড়ছে হু হু করে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের দক্ষতা অর্জিত হচ্ছে না। অর্জিত হচ্ছে না নৈতিক জ্ঞান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাগ্রত করা যাচ্ছে না দেশপ্রেম। সব কিছুতেই শিক্ষকদের পালন করতে হবে অগ্রণী ভূমিকা।

কিন্তু মানস¤পন্ন ও মেধাবী প্রার্থীরা শিক্ষকতা পেশায় আসছেন না। শিক্ষক নিয়োগের জন্য আট-দশ-বারো লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। কী পড়াবেন তারা? এগুলো দূর করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় চালু করল এনটিআরসিএ (নন-গভর্নমেন্ট টিচার্স রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেশন অথরিটি)। এনটিআরসিএ থেকে পরীক্ষা দিয়ে সার্টিফিকেট অর্জন করতে হবে। একমাত্র এই সার্টিফিকেটধারীরাই বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষকতার জন্য আবেদন করতে পারবেন।

আশা ছিল শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীরা আসবেন কিন্তু ইদানীং জানা যাচ্ছে, হাজার হাজার জাল সার্টিফিকেট বিতরণ করছেন এনটিআরসিএর একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী। এটি আবার ধরা পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরই মনিটরিং টিমের কাছে।

শিক্ষকতা একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশা । এ প্রসঙ্গে দার্শনিকদের মতামত Ñ

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল তাই বলেছেন, “যাঁরা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী তাঁরা অবিভাবকদের থেকেও অধিক সম্মাননীয়। পিতামাতা আমাদের জীবনদান করেন ঠিকই। শিক্ষকরা সেই জীবনকে সুন্দর ভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।” শিক্ষাবিদ হজরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর সেই চিরন্তন বাণী দিয়ে শেষ করবো, “তুমি যদি একটা পুরুষকে শিক্ষা দাও , তাহলে শুধু ওই পুরুষটি শিক্ষিত হয়ে উঠবে। আর যদি একটা নারীকে শিক্ষা দাও, তাহলে গোটা জাতিকে শিক্ষিত করবে।” পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন ,‘ঐব যধং ংবৎাবফ যরং হধঃরড়হ রহ সধহু পধঢ়ধপরঃরবং নঁঃ ধনড়াব ধষষ, যব রং ধ মৎবধঃ ঃবধপযবৎ ভৎড়স যিড়স ধষষ ড়ভ ঁং যধাব ষবধৎহঃ সঁপয ধহফ রিষষ পড়হঃরহঁব ঃড় ষবধৎহ. ‘পৃথিবীতে যে যত মহৎ হোক না কেন, সে কোন না কোন শিক্ষকের অধীনে জ্ঞান অর্জন করেছে’। প্রচারক এবং ধর্মতত্ত্ববিদ উইলিয়াম এলারারি চ্যানিং বলেনÑ ‘একটি শিশুকে শিক্ষিত করে তোলা একটি বড় কাজ- এবং সঠিকভাবে বলতে গেলে, একটি রাষ্ট্র শাসনের চেয়েও বড় কাজ’। সাংবাদিক এ্যান্ডি রনি বলেন, ‘ বেশিরভাগ লোককে বড়জোর ৫ থেকে ৬ জনের বেশি স্মরণ করে না, কিন্তু একজন শিক্ষককে হাজার হাজার মানুষ আজীবন স্মরণ করে। সুইস মনোবিজ্ঞানী কার্ল জং বলেন,‘ ব্রিলিয়ান্ট শিক্ষকদের প্রতি লোকেরা সম্মানের দৃষ্টিতে তাকায়, কিন্তু কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকায় তাদের প্রতি, যারা আমাদের মানবিক অনুভূতিকে ¯পর্শ করে। পাঠ্যক্রমটি নিতান্তই প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, কিন্তু আন্তরিকতা একটি ক্রমবর্ধমান উদ্ভিদ এবং একটি শিশুর আত্মার জন্য আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান’।- সিলিকন-উপত্যকা ভিত্তিক একজন লেখক, ¯িপকার, উদ্যোক্তা এবং ধর্মপ্রচারক গাই কাওয়াসাকি বলেন,‘আপনি যদি কাউকে পছন্দের তালিকায় রাখতে চান, তাহলে শিক্ষকদের রাখুন,তারা সমাজের নায়ক’। এ থেকে শিক্ষকের মর্যাদা সহজেই অনুমেয় ।

প্রিয় শিক্ষক তাঁরাই। তাঁদের øেহে, প্রশ্রয়ে, শিক্ষায়, সহমর্মিতায়, মরমী সমালোচনায়, চরিত্র গঠনের দৃঢ় শিক্ষায় আমরা ঋদ্ধ হতে থাকি ক্রমশ। আমাদের প্রতিটি আচরণের বহির্প্রকাশ ঠিক কী হবে, শিশুবয়স থেকেই উচিত-অনুচিতের বোধ আমরা শিখতে থাকি তাদের কাছেই।

আমাদের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ, আমাদের দায়বদ্ধতা বিশ্বাস, অন্যকে মান্যতা দেওয়া, গুরুজনকে সম্মান জানানো, নিজেদের পারিবারিকরীতিকে মর্যাদা দেওয়া, রক্ষণশীলতাকে টিকিয়ে রাখা এই সমস্ত কিছুই শিখি বাড়ির গুরুজন ও অভিভাবকদের থেকেই। আমাদের আদর্শ আমাদের চরিত্রগঠন সব কিছুর প্রাপ্তি তাঁদের থেকেই। শিক্ষক দিবসে বাবা-মা-কেই অন্যতম প্রারম্ভিক শিক্ষক তথা গুরু হিসেবে স্মরণ করে প্রণতি জানাতেই পারি। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও শিক্ষকতা একটি মহান পেশা হিসেবে স্বীকৃত।

তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মানসম্মত শিক্ষা। বিভিন্ন পরীক্ষার রেজাল্টে পাসের আধিক্য বাড়লেও গুণগত মান নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাই মানসম্মত শিক্ষাদানের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষতাস¤পন্ন শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান নিশ্চিত করতে হবে,পাশাপাশি শিক্ষকদের সকল সুযোগসুািবধা বৃদ্ধি করতে হবে । দেশের ক্ষমতাসীন সরকারের সময়ে ধাপে ধাপে সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ হোক -এটাই হোক বিশ্বশিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার।


ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন

লেখক : গবেষক ও লেখক .

 


বিভাগ : মতামত