পুড়ছে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ আমাজন বনভূমি

২৩ আগস্ট ২০১৯, ০৫:৪৯ পিএম | আপডেট: ২১ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:১৩ পিএম


পুড়ছে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ আমাজন বনভূমি
সংগৃহিত ছবি

বিদেশ ডেস্ক:

দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদের পাশে প্রায় ৫৫ লাখ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে  অবস্থান সুবিশাল রেইন ফরেস্ট আমাজনের। পৃথিবীর ২০ ভাগ অক্সিজেনের  যোগান হয় ওই আমাজন থেকে। বিভিন্ন নাম না জানা উপজাতির বাসস্থানসহ আমাজনে রয়েছে ১৬ হাজার প্রজাতির গাছপালা। কিন্তু ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ আমাজন আজ বিপন্ন। আগুনের লেলিহান শিখা ক্রমশ গ্রাস করছে ওই চিরহরিৎ বনভূমিকে।

ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইনপে-র সমীক্ষা বলছে, চলতি বছর আমাজন রেইন ফরেস্টে ৭২ হাজার ৮৪৩টি দাবানলের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। গত বছরের এই সময়ের তুলনায় যা ৮৩ শতাংশ বেশি এবং ২০১৩ সালের তুলনায় দ্বিগুণ! এই প্রকোপ আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি ইনপে-র।

আগুনের কারণে কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ায় ঢাকা পড়েছে সূর্যের মুখ। এমনকি দুই হাজার ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ব্রাজিলের সাও পাওলোর দুপুরের আকাশ যেন ‘রাতের চেয়েও অন্ধকার’ হয়ে উঠেছে এই আগুনের ধোঁয়ায়। ব্রাজিলের রোরাইমা প্রদেশ থেকে পেরুর আকাশেও হানা দিয়েছে ধোঁয়া।

মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার উপগ্রহ চিত্রেও ধরা পড়েছে আমাজনে ঘটতে থাকা ৯ হাজার ৫০৭টি নতুন দাবানলের চিত্র। আমাজনের আগুনের ওপর নজর রাখছে নাসা। আগুনের তীব্রতার ছবিও পাঠাচ্ছে নাসার একাধিক স্যাটেলাইট। তবে আগুনের থেকেও বিজ্ঞানীদের বেশি ভাবাচ্ছে আগুন থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া নিয়ে। প্রায় এক হাজার ৭০০ কিমি দূরত্ব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এই কালো ধোঁয়া।

ক্রান্তীয় অঞ্চলে হওয়ায় বছরের বেশিরভাগ সময় বৃষ্টিপাত হলেও জুলাই-আগস্ট মাসে আমাজনের আবহাওয়া কিছুটা শুষ্ক হয়ে ওঠে। তবে স্থানীয় পরিবেশবিদদের ধারণা, প্রাকৃতিকভাবে এই আগুন লাগেনি।

ব্রাজিলের ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের একাংশ বলছেন, শুকনো বাতাসে দাবানল জ্বলে ওঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এক্ষেত্রে দাবানলের প্রকোপে আগুন লাগেনি বলেই মনে করছেন তারা। ওই বিজ্ঞানীদের মতে, অনেক সময়ই চাষের জন্য জমি বা খামার তৈরি করতে ইচ্ছাকৃতভাবে জঙ্গলে আগুন ধরিয়ে দেন স্থানীয় গ্রামবাসীরা। এক্ষেত্রেও এমনটাই হচ্ছে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

জলবায়ু বিজ্ঞানী কার্লোস নোব্রে বলেছেন, গবাদিপশুর চারণভূমি হিসেবে জমি ব্যবহার করতে চাওয়া কৃষকেরা জায়গা পরিষ্কার করতে শুকনো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন। এসময় বন দাহ্য হয়ে থাকে এবং খুব সহজেই তাতে আগুন লাগে। যদিও সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের গবেষক নোব্রের মতে, আমাজনে কর্মরত এনজিওগুলো কৃষিকাজে আগুন ব্যবহার করে না। তারা বরং লোকজনকে আগুন ব্যবহার না করতে উৎসাহিত করে।

খনিজ পদার্থের ভাণ্ডার এই আমাজন বন। খনিজ পদার্থের খোঁজে আমাজন বন লাগাতার সাফ করে খনন কাজ চালানো হয়। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি মিনিটে একটি ফুটবল মাঠের সমান জঙ্গল কাটা হয় এখানে। ফলে স্বল্প বৃষ্টিপাতও আমাজনে আগুন লাগার অন্য একটি কারণ হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীদের একটি অংশ। কার্বন ছাকনি হিসেবে পরিচিত চিরসবুজের ওই জায়গা যে এই ঘটনার পর তার কার্যক্ষমতা হারাবে সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রায় সব গবেষক।

এদিকে আমাজনে ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জেইর বোলসোনারোর নীতিকে কাঠগড়ায় তুলেছেন পরিবেশবিদরা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার আগে আন্তর্জাতিক হুঁশিয়ারির তোয়াক্কা না-করেই আমাজন অঞ্চলকে চাষ ও খনিজ উত্তোলনের কাজে ব্যবহারের কথা বলেছিলেন তিনি।

তার এ উদ্যোগের ফলে বন উজাড় হয়ে যেতে পারে—আন্তর্জাতিক মহলের এমন উদ্বেগ দিনের পর দিন উপেক্ষা করে গেছেন বোলসোনারো। ফলস্বরূপ আমাজনে অন্তত ৭২ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মৃত্যু হয়েছে অনেক পশুপাখিরও।

যদিও বোলসোনারোর বলেছেন, এ নিয়ে শুধু শুধু তাকে দোষ দেয়া হচ্ছে। এই সময়ে আগুন জ্বালিয়ে চাষের জমি তৈরি করেন চাষিরা। সেটাই হয়ে আসছে। ইনপে-র পরিসংখ্যানকে ‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দিয়ে ইনপে-র ডিরেক্টরকে বরখাস্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট।


বিভাগ : বিশ্ব